আয় ও ভোগে বৈষম্য বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর মালিকানায় ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সম্পদের বণ্টনগত ব্যবধান দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সম্পদের বণ্টনগত ব্যবধান দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। দেশটিতে একদিকে শেয়ারবাজারের উল্লম্ফন থেকে ধনিদের আয় ফুলেফেঁপে উঠছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, সম্পদ আহরণে ওপর সারিতে থাকা ১ শতাংশ মার্কিন ধনীর সম্পদ পৌঁছেছে ৫২ ট্রিলিয়ন বা ৫২ লাখ কোটি ডলারে। এছাড়া দেশটির ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই দখলে রেখেছেন শীর্ষ ১০ শতাংশ। খবর সিএনবিসি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার চলতি বছর শেষে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। সে অনুযায়ী, দেশটির অর্থনীতির মোট আয়তনের প্রায় পৌনে দুই গুণ জড়ো হয়েছে দেশটির মাত্র ১ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে।

ফেড তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সম্পদের নিরিখে শীর্ষ ১০ শতাংশ মার্কিন সম্মিলিতভাবে নিজেদের পোর্টফোলিওতে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছে। কারণ শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক উত্থান। এ শ্রেণীতে থাকা ব্যক্তিরা পুঁজিবাজার বিনিয়োগ থেকে বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করেছেন।

এ শীর্ষ ১০ শতাংশের গড় নিট সম্পদ ২০ লাখ ডলার বা তার বেশি। তাদের সম্পদ সম্মিলিতভাব এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে রেকর্ড ১১৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তাদের সম্পদের আকার ছিল ১০৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এতে দেখা যাচ্ছে, টানা তিন বছর ধরে মার্কিন শীর্ষ ধনীদের সম্পদ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালের পর থেকে সম্মিলিতভাবে শীর্ষ ১০ শতাংশের সম্পদ বেড়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।

ফেডের তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সব শ্রেণীতে সম্পদ বেড়েছে। এর মধ্যে সম্পদ শ্রেণীর নিচের অর্ধেক মার্কিনের নিট সম্পদ বেড়েছে ৬ শতাংশ। সম্পদ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে দ্রুত শীর্ষ স্তরে। শীর্ষ ১ শতাংশ মার্কিনদের সম্পদ গত এক বছরে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। জুনে শেষ হওয়া চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের সম্মিলিত সম্পদ রেকর্ড ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে সবচেয়ে বেশি সম্পদ বেড়েছে শীর্ষ দশমিক ১ শতাংশ ধনীর। সর্বশেষ এক বছরে তাদের সম্পদ বেড়েছে ১০ শতাংশ। এ শ্রেণীতে রয়েছেন সেসব ধনী, যাদের সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কভিড মহামারীর পর থেকে সম্মিলিতভাবে তাদের সম্পদ দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

শীর্ষ ধনীদের সম্পদ দ্রুত বাড়লেও কয়েক দশক ধরে মোট মার্কিন সম্পদে তাদের হিস্যা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শীর্ষ ১ শতাংশ মার্কিন মোট গৃহস্থালি সম্পদের ২৯ শতাংশের মালিকানা ধারণ করেছিল, যা ২০০০ সালে ছিল ২৮ শতাংশ। শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে ছিল মোট গৃহস্থালি সম্পদের ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে নিচের ৯০ শতাংশের হাতে ছিল সম্পদের ৩৩ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছর সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রধান চালিকাশক্তি হলো শেয়ারবাজার। শীর্ষ ১০ শতাংশ মার্কিনের হাতে থাকা করপোরেট ইকুইটিজ ও মিউচুয়াল ফান্ড শেয়ারমূল্য এক বছরে ৩৯ ট্রিলিয়ন থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। করপোরেট ইকুইটিজ ও মিউচুয়াল ফান্ড শেয়ারের ৮৭ শতাংশের বেশি রয়েছে শীর্ষ ১০ শতাংশ আমেরিকানের নিয়ন্ত্রণে।

দেশটিতে অতিধনীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সাধারণত ৩ কোটি ডলার বা তার বেশি সম্পদধারী ব্যক্তিদের এ শ্রেণীতে ফেলা হয়। গবেষণা সংস্থা আলট্রাটার নতুন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্রে অতিধনী বেড়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে গত বছর বৃদ্ধির হার ছিল ২১ শতাংশ। এখন যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ ৮ হাজার ৯০ অতি উচ্চ সম্পদধারী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিশ্বব্যাপী এ শ্রেণীর সম্পদধারীর ৪১ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক বিভিন্ন শ্রেণীতে সম্পদ বৃদ্ধির এ পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান বিভক্ত একটি ভোক্তা অর্থনীতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ধনীরা মোট ব্যয়ের বড় একটি অংশ দখল করছে। বাজারও তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আয় বণ্টনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ শতাংশ দ্বিতীয় প্রান্তিকে সম্মিলিতভাবে ভোক্তা ব্যয়ের ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ দখলে রেখেছে। বিশ্লেষক সংস্থা মুডিজ অ্যানালিটিকসের মার্ক জ্যান্ডি জানিয়েছেন, ১৯৮৯ সাল থেকে মার্কিন ভোক্তা ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তখন থেকে ভোক্তা ব্যয়ে ১০ শতাংশ মার্কিনের সর্বোচ্চ অবদান দেখা গেছে এবার।

মার্কিন অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের এ ব্যবধান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি’র কথা বারবার উঠে আসছে। এতে এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা সংকোচন সবার জন্য সমানভাবে ঘটে না, যা দেখতে কে-আকৃতির মতো হয়। এতে উচ্চ ধনীর জন্য ক্রমবর্ধমান উন্নতি দেখা যায়, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আয় স্থির বা কমে যাচ্ছে। অর্থনীতি যদি শীর্ষ একটি অংশের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বাড়ায়, এতে ঝুঁকিও বাড়ে।

মার্ক জ্যান্ডি বলেন, ‘শীর্ষে প্রায় সব সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান উৎস শেয়ারবাজার। এতে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পতন অর্থনীতিতে বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনীতি অনেকাংশেই অতিধনী ব্যক্তিদের ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। যদি শেয়ারবাজারে হঠাৎ পতন ঘটে এবং ধনীরা দ্রুত তাদের ব্যয় কমিয়ে দেয়; এটি এরই মধ্যে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি।’

আরও